মহেশখালীতে বন বিভাগের আপত্তিতে থমকে আছে লাখো মানুষের চলাচলের রাস্তা; ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা

অনিশ্চয়তায় এলজিইডির প্রকল্প

মহেশখালীতে বন বিভাগের আপত্তিতে থমকে আছে লাখো মানুষের চলাচলের রাস্তা; ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা


এরফান হোছাইন:

কক্সবাজারের মহেশখালীতে লাখো মানুষের যাতায়াতের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন একটি পাকা সড়ক। জনদুর্ভোগ লাঘবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বিপুল ব্যয়ে সড়কটি নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও বন বিভাগের আপত্তিতে থমকে গেছে সেই কাজ। জনস্বার্থে প্রকল্পটির কাজ এগিয়ে নিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য বন বিভাগকে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিলেও তাতে কোনো সুরাহা হয়নি। উল্টো বন বিভাগের অনড় অবস্থানের কারণে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

কাদা মাড়িয়ে চলে শিক্ষার্থীরা, দীর্ঘ হচ্ছে জনদুর্ভোগঃ

মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের জেএম ঘাট থেকে কালারমারছড়া পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য একটি পুরোনো কাঁচা পথ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি পাকা করার উদ্যোগ নেয় এলজিইডি। জাইকার অর্থায়নে ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সমতলের কিছু অংশে ঢালাইয়ের কাজ এবং কালভার্ট নির্মাণও এগিয়ে চলছিল।

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কটিতে বর্তমানে যানবাহন চলাচলের কোনো সুযোগ নেই। ফলে বর্ষা মৌসুমে পুরো রাস্তাটি কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। এই রুটে গাড়ি চলাচল না করায় স্কুল-কলেজগামী কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন মাইলের পর মাইল কাদা মাড়িয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। স্থানীয়দের মতে, এই সড়কটি পাকা হলে দুই ইউনিয়নের লাখো মানুষের যাতায়াতের দূরত্ব ও সময় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসত এবং এলাকার সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটত।

বন বিভাগের আপত্তিঃ

প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান হওয়ার পরপরই এতে আপত্তি জানায় কক্সবাজার উপকূলীয় বন বিভাগ। তাদের দাবি, যে বনের ভেতর দিয়ে এলজিইডি পাকা রাস্তা করতে চায়, সেটি ১৯৫৭ সালে ঘোষিত সংরক্ষিত বনভূমি (মহেশখালীর ১২ নম্বর মৌজার ১৮ হাজার ২৮৬ একর)।

কক্সবাজার উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ জানান, সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সাধারণ মানুষের পায়ে হাঁটার পথ থাকলেও সেখানে পাকা রাস্তা করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। পাকা রাস্তা হলে বনভূমি পাচারকারী ও দখলদারদের সুবিধাই হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বনের ভেতর কাজ বন্ধ না করলে এলজিইডির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই আপত্তির পর থেকেই বনাঞ্চল অংশে কাজ পুরোপুরি আটকে আছে।

সংসদ সদস্যের ডিও লেটার ও এলজিইডির যুক্তিঃ

বন বিভাগের আপত্তির কারণে লাখো মানুষের দুর্ভোগ যখন দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তখন জনস্বার্থে এগিয়ে আসেন মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ। তিনি রাস্তা নির্মাণে বাধা সৃষ্টি না করে সহযোগিতা করার জন্য বন বিভাগকে একটি ডিও লেটার দেন। তবে বন বিভাগ আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে সেই অনুরোধও নাকচ করে দেয় এবং জানায়, সংরক্ষিত বনে কিছু করতে হলে সরকারপ্রধানের বিশেষ অনুমোদন প্রয়োজন।

অন্যদিকে, মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) বনি আমিন জনি বলেন, "এটি এলজিইডির নিজস্ব গেজেটভুক্ত রাস্তা। সম্পূর্ণ জনগণের প্রয়োজনের নিমিত্তেই রাস্তাটি পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিচের অংশে কিছু কাজ হয়েও গেছে, কিন্তু বন বিভাগের বাধার কারণে মূল কাজ এগোতে পারছে না।" বিষয়টি সমাধানের জন্য তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেন।

‘বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য একটি আজগুবি গল্প’: ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা

বন বিভাগের এই অনড় অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন মহেশখালীর সাধারণ মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল হক জানান, "এই রাস্তাটি আজকের নয়, অন্তত ৩০ বছর ধরে মানুষ এই পথে চলাচল করছে এবং এটি এলজিইডির নিজস্ব আইডিভুক্ত রাস্তা। নতুন করে বন কেটে রাস্তা নির্মাণের যে কথা বন বিভাগ ও কতিপয় পরিবেশবাদী ছড়াচ্ছে, তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন। সরেজমিনে না এসেই তারা বিরোধিতা করছে। এখানে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য বলে যা প্রচার করা হচ্ছে, তা বানোয়াট ও আজগুবি গল্প। মানুষের চলাচলের স্বার্থে যখনই এলজিইডি কাজ করতে চাইল, তখনই তাদের বিরোধিতা শুরু হলো।"

আরেক বাসিন্দা আতাউল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "মহেশখালী ও সোনাদিয়ায় প্রভাবশালীরা হাজার হাজার একর প্যারাবন (ম্যানগ্রোভ) কেটে ২০-৩০টির বেশি চিংড়ি ঘের তৈরি করেছে। পাহাড় কেটে বহুতল ভবনসহ নানা অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছে। তখন কিন্তু বন বিভাগ বা নামধারী পরিবেশবাদীদের কোনো টুঁ শব্দ শোনা যায় না! রাঘববোয়ালদের আড়ালে রেখে তারা সাধারণ ও নিরীহ কিছু মানুষকে আসামি করে নামেমাত্র মামলা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে।" কতিপয় পরিবেশবাদীর বিরুদ্ধেও সুবিধা নিয়ে এসব প্রভাবশালীকে আসকারা দেওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা কামাল বলেন, "প্রকৃতি ধ্বংস করে একের পর এক রাঘববোয়ালদের যখন দখলদারিত্ব চলে, তখন বন বিভাগ নিজেদের অসহায় দাবি করে। কিন্তু স্থানীয় মানুষের চলাচলের স্বার্থে এলজিইডি বা জনপ্রতিনিধিরা যখন কোনো কাজ করতে যান, তখনই তাদের আইনের সব ধারার কথা মনে পড়ে যায়।"

সমন্বয়হীনতার অবসান চায় ভুক্তভোগীরা

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেএম ঘাট থেকে শুরু হওয়া সড়কটির সমতল অংশে এখনো কিছু শ্রমিক কাজ করছেন। তবে সড়কের যে অংশটি পাহাড় ও বনের ভেতর দিয়ে গেছে, সেখানে কাজ পুরোপুরি বন্ধ।

স্থানীয় ভুক্তভোগী জনগণের দাবি—যেই বন বিভাগ চোখের সামনে হাজার একর সংরক্ষিত বন ও পাহাড় গিলে খাওয়া ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পারে না, তাদের মুখে সাধারণ মানুষের ও শিক্ষার্থীদের চলাচলের রাস্তার ক্ষেত্রে আইনের বুলি মানায় না। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে কীভাবে দ্রুত এই জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটি সম্পন্ন করা যায়, সেজন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও দুই দপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ