আহত যুবক চমেক হাসপাতালে আশঙ্কাজনক; অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রয়েছে আওয়ামী আমলে ত্রাস সৃষ্টির বিস্তর অভিযোগ
চকরিয়া প্রতিনিধি |
কক্সবাজারের চকরিয়ায় ভিকটিম উদ্ধারের নামে এক নবদম্পতিকে প্রকাশ্য দিবালোকে বেধড়ক লাঠিপেটা ও নির্মম নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে চকরিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আরকানুল ইসলামের বিরুদ্ধে। পুলিশের এই নৃশংসতার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পুরো জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল শনিবার (৩০ মে) বিকেলে চকরিয়া উপজেলার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের ছাইরাখালী এলাকায় এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে। পুলিশের পিটুনিতে গুরুতর আহত যুবককে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পর জনরোষ এড়াতে এবং বিভাগীয় তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত এসআই আরকানুলকে রাতেই চকরিয়া থানা থেকে প্রত্যাহার করে কক্সবাজার জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়েছে।
প্রেমের বিয়ে ও পুলিশের হঠকারী অভিযান:
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ঈদগাঁও উপজেলার ২০ বছর বয়সী এক তরুণীর সঙ্গে চকরিয়ার ছাইরাখালী এলাকার মো. নূরু মাঝির ছেলে নূরুল আমিনের (২৪) প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সম্প্রতি উভয় পরিবারের সম্মতিতে এবং দেনমোহর নির্ধারণ করে তাঁদের বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। তবে মেয়ের পক্ষের কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্য এই বিয়েতে অসন্তুষ্ট হয়ে চকরিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা নিখোঁজ অভিযোগ দায়ের করেন।
উক্ত অভিযোগের ভিত্তিতে শনিবার বিকেলে পুলিশ দল ওই তরুণীকে উদ্ধার করতে নূরুল আমিনের বাড়িতে যায়। তবে তরুণীটি স্বেচ্ছায় পুলিশের সঙ্গে যেতে অস্বীকৃতি জানালে প্রথম টিমটি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। পরবর্তীতে এসআই আরকানুল ইসলামের নেতৃত্বে আরেকটি পুলিশ দল ঘটনাস্থলে গিয়ে চড়াও হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে পুলিশ সদস্যরা ঘরে ঢুকে নির্বিচারে লাঠিচার্জ শুরু করেন। পুলিশের নির্মম পিটুনিতে নূরুল আমিন ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় রাতেই তাঁকে চমেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এদিকে পুলিশের এমন মারমুখী আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে গ্রামবাসী পুলিশের ব্যবহৃত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাঙচুর করে সড়ক অবরোধের চেষ্টা চালায়। পরে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
কে এই বিতর্কিত এসআই আরকান?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চকরিয়া থানার এসআই আরকানুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পূর্বে তিনি দীর্ঘদিন ঈদগাঁও থানায় কর্মরত ছিলেন। সে সময় ঈদগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের অবৈধ এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও বিরোধী মত দমনের মূল কারিগর ছিলেন এই আরকান।
অভিযোগ রয়েছে, জুলাই বিপ্লবের সময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী এবং বিএনপি-জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীদের গণহারে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব দালাল চক্র এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের (বিকাশ ও নগদ) মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর নিজেকে বাঁচাতে রাতারাতি রূপ বদলে তিনি নিজেকে বিএনপি-জামায়াতপন্থি দাবি করে তদবির শুরু করেন। পরবর্তীতে নিজের এসব অপকর্ম আড়াল করতে এবং বিভাগীয় তদন্ত থেকে বাঁচতেই তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চকরিয়া থানায় বদলি হয়ে আসেন বলে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্রে গুঞ্জন রয়েছে।
অভিযুক্তের অদ্ভুত দাবি ও প্রশাসনের বক্তব্য
নৃশংস হামলার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও নিজের অপরাধ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত এসআই আরকানুল ইসলাম। তিনি দাবি করেন:
"আমি ভিডিওতে কাউকে বেত্রাঘাত বা মারধর করিনি। মূল অভিযুক্ত ব্যক্তি মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে চেপে রাখছিল, তাই মেয়েটিকে ছাড়ানোর জন্য আমি লাঠি দিয়ে খাটের ওপর আঘাত করছিলাম।"
তবে ভিডিও ফুটেজে পুলিশের মারমুখী আচরণ স্পষ্ট দেখা গেছে। এই বিষয়ে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন,
"একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে অপহরণের অভিযোগ পেয়ে পুলিশ ফোর্সকে অভিযানে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে পুলিশ হামলার শিকার হয়েছে শুনে আমি নিজে অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। তবে অভিযানে গিয়ে মারধর করার অনাহুত অভিযোগটি ওঠার পর বিভাগীয় তদন্তের সুবিধার্থে শনিবার রাত ১টার দিকেই এসআই আরকানুলকে চকরিয়া থানা থেকে প্রত্যাহার করে কক্সবাজার জেলা পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা হয়েছে।"
চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার(এএসপি) অভিজিৎ দাশ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মেয়েটিকে উদ্ধার করতে গেলে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে এবং দুই পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ভিকটিম উদ্ধারের এই অভিযানে পুলিশের কোনো সদস্যের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গাফিলতি বা দোষত্রুটি প্রমাণিত হলে তাকেও কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

0 মন্তব্যসমূহ