কলাতলীতে পাহাড় কেটে সাবাড়: এক মাসেই সমতল ৫টি স্পট
এক্সক্যাভেটর দিয়ে রাত-দিন চলছে ধ্বংসযজ্ঞ; প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
কক্সবাজার প্রতিনিধি
কক্সবাজারের পর্যটন এলাকা কলাতলীর সুউচ্চ পাহাড়গুলো এখন ভূমিদস্যুদের আগ্রাসনের মুখে। মাত্র এক মাস আগেও যেখানে ছিল ঘন জঙ্গল আর বড় বড় গাছের সারি, সেখানে এখন ধু-ধু সমতল ভূমি। কলাতলী বিকাশ বিল্ডিংয়ের পেছনের প্রায় ৫টি স্পটে পাহাড় কেটে রীতিমতো মাঠ তৈরি করে ফেলা হয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, পাহাড় বিনাশের এই মহোৎসব চললেও স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর রহস্যজনকভাবে ‘নির্বিকার’ ভূমিকা পালন করছে।
সরেজমিন চিত্র: পাহাড়ের ক্ষত আর উপড়ে পড়া বৃক্ষ
সরেজমিনে কলাতলী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পাহাড় কাটার ভয়াবহ এক দৃশ্য। বিশালাকৃতির একটি পাহাড়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে গায়েব হয়ে গেছে। এক্সক্যাভেটর (খননযন্ত্র) ও বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ব্যবহার করে রাত-দিন সমানতালে চলছে এই ধ্বংসযজ্ঞ। পাহাড় কেটে তৈরি করা সমতল জায়গাটি দেখতে এখন একটি বড় মাঠের মতো। দুই পাশে পাহাড়ের কাটা অংশে খননযন্ত্রের গভীর ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট। পাহাড় থেকে উপড়ে ফেলা বড় বড় বৃক্ষের শেকড়গুলো এখনো কাটা অংশ দিয়ে বেরিয়ে আছে, যা এই প্রকৃতির ওপর চালানো নৃশংসতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।
প্রভাবশালী চক্রের পকেটে পাহাড়ের মাটি
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, একটি প্রভাবশালী চক্র এই পাহাড় কাটার নেপথ্যে কাজ করছে। চক্রটি পাহাড়ের মাটি কেটে বিভিন্ন জায়গায় চড়া দামে বিক্রি করে দিচ্ছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় হলেও আইন অনুযায়ী তা কাটার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে চক্রটি দিনের পর দিন এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
আইন কী বলছে?
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি বা ছাড়পত্র ছাড়া সরকারি বা ব্যক্তিগত—যেকোনো ধরনের পাহাড় বা টিলা কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইন অমান্য করলে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা, এমনকি উভয় দণ্ড হতে পারে। কিন্তু কলাতলীতে এই আইনের কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।
পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ
পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা বলছেন, কক্সবাজারে পাহাড় কাটা যেভাবে বাড়ছে, তাতে অচিরেই পরিবেশের ভারসাম্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। পরিবেশবিদ কলিম উল্লাহ বলেন, “পাহাড় কাটার ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। এখনই যদি কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে পর্যটন নগরী তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারাবে।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
পাহাড় কাটার ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে চাইলে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক পাশা বিস্ময়কর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “পাহাড় কাটার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো পাহাড়ই কাটার সুযোগ নেই। আপনারা নিউজ (সংবাদ) করে দেন, আমরা সেই সংবাদের সূত্র ধরে খোঁজ নেব এবং দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেব।”
পরিবেশ রক্ষায় নিয়োজিত খোদ দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন বক্তব্য প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। যেখানে পাহাড় কাটার শব্দ ও এক্সক্যাভেটরের গর্জন নিয়মিত শোনা যাচ্ছে, সেখানে ‘খবর না জানা’র বিষয়টি প্রশাসনের আন্তরিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। সচেতন মহলের দাবি, নিউজ প্রকাশের অপেক্ষা না করে অবিলম্বে এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

0 মন্তব্যসমূহ