মহেশখালীতে চবি অ্যালামনাই পুনর্মিলনীতে নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা: রেস্তোরাঁ কেলেঙ্কারি ও ছাত্রলীগের দাপটে চবিয়ানদের তীব্র ক্ষোভ
২ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েও বাতিল ‘মেহেল’-এর অর্ডার, নিজস্ব রেস্তোরাঁ থেকে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ; উপহারের ব্যাগ নিয়ে কাড়াকাড়ি
নিজস্ব প্রতিবেদক, মহেশখালী | ৩১ মে, ২০২৬
কক্সবাজারের মহেশখালীতে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানটি নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা, রেস্তোরাঁ কেলেঙ্কারি, তীব্র আঞ্চলিক বৈষম্য এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দাপটের কারণে চরম বিতর্কের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এক বর্ণিল মিলনমেলা হওয়ার কথা থাকলেও, আয়োজক কমিটির চরম উদাসীনতা ও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির কারণে সাধারণ চবিয়ানদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা গেছে। এমনকি পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ‘ভিলেজ পলিটিক্স’ বা স্থানীয় সংকীর্ণ রাজনীতির চাপে এই আয়োজনের মূল সমন্বয়ক ও প্রধান আয়োজক, সরকারের উপসচিব আবুল হাসেমকে অনুষ্ঠানে উপস্থিতই হতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
২ লাখ টাকার অগ্রিম বাতিল: নেপথ্যে রেস্তোরাঁ কেলেঙ্কারি
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে দুপুরের খাবার সরবরাহ নিয়ে। চবির প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, অনুষ্ঠানের খাবারের জন্য প্রথমে স্থানীয় ‘মেহেল রেস্টুরেন্ট’-এ ২ লাখ টাকা অগ্রিম (অ্যাডভান্স) দিয়ে অর্ডার চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার দাপট ও অনৈতিক হস্তক্ষেপে মেহেলের সেই অর্ডারটি রহস্যজনকভাবে বাতিল করা হয়। এর পরিবর্তে আয়োজক কমিটির একাংশের মালিকানাধীন ‘সাহাবুদ্দিন টাব ও রেস্টুরেন্ট’ থেকে অত্যন্ত নিম্নমানের খাবার এনে চবিয়ানদের পরিবেশন করা হয়।
এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জামাল উদ্দিন নামের এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী আয়োজক কমিটির প্রধান আবুল হাসেমকে উদ্দেশ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপে লিখেন:
"কেন ‘মেহেল’ রেস্টুরেন্টে ২ লক্ষ টাকা অ্যাডভান্স করার পর অর্ডার বাতিল করা হলো? সকালের দুইটা খেজুর আর নামমাত্র পাউরুটি—এগুলো কি কোনো নাস্তা হলো? দুপুরের খাবারের এত বাজে অবস্থা কেন?"
খাবারের বেহাল দশা: বাসি পাউরুটি ও গরমে ঠান্ডা পানির পরিবর্তে গরম পানি
তীব্র তাপদাহের মধ্যে আয়োজিত এই পুনর্মিলনীতে আপ্যায়নের নামে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তামাশা করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
সকালের নাস্তা: দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা সাবেক শিক্ষার্থীদের সকালের নাস্তায় পরিবেশন করা হয় অত্যন্ত নিম্নমানের বাসি পাউরুটি এবং বালিযুক্ত সস্তা দুটি খেজুর।
দুপুরের খাবার ও গরম পানি: এক রাজনৈতিক নেতার মালিকানাধীন পছন্দ অনুযায়ী নিজস্ব রেস্তোরাঁ থেকে দুপুরের খাবার আনা হলেও তা ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। এছাড়া তীব্র গরমে তৃষ্ণার্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা ছিল না; উল্টো প্রায় ফুটন্ত গরম পানি সরবরাহ করা হয়।
বিকেলের নাস্তা: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিকেলের নাস্তায় দেওয়া হয় মাত্র একটি সস্তা ও নিম্নমানের কেক, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের জন্য অপমানজনক বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন ও গুণীজনদের অবমাননা
উৎসবের আড়ালে মহেশখালীর ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে এক কুৎসিত ‘উত্তর-দক্ষিণ’ বিভাজন তৈরি করার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে উত্তর মহেশখালীর হোয়ানক, কালারমারছড়া, মাতারবাড়ী, ধলঘাটা ও শাপলাপুর ইউনিয়নের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের চরম অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। দক্ষিণ মহেশখালীর একটি প্রভাবশালী মহলের একচ্ছত্র দাপটের কারণে উত্তরের বহু প্রবীণ ও গুণী চবিয়ানদের ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন করা হয়নি। এমনকি ক্রেস্ট ও স্মারক উপহার সামগ্রী বিতরণেও তীব্র স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়।
উপহারের ব্যাগ চুরি ও মাটিতে ‘হামাগুড়ি’
আয়োজনের সবচেয়ে লজ্জাজনক দৃশ্যের অবতারণা হয় স্মারক উপহার (ব্যাগ) বিতরণকে কেন্দ্র করে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল বণ্টন প্রক্রিয়া না থাকায় দক্ষিণ মহেশখালীর বেশ কিছু প্রাক্তন শিক্ষার্থী তাঁদের সাথে নিয়ে আসা বহিরাগতদের দিয়ে উপহার সামগ্রী ও ব্যাগ লুটপাট করান। একপর্যায়ে ব্যাগ চুরির হিড়িক পড়লে ব্যাগ বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ ও নবীন প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের রীতিমতো মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে ব্যাগ নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে দেখা যায়। এই ন্যাক্কারজনক দৃশ্যের ভিডিও ও ছবি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় নেটদুনিয়ায় তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
অরাজনৈতিক মঞ্চে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অরাজনৈতিক এই অ্যালামনাই অনুষ্ঠানটি মূলত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। মিলনমেলা সফল করার চেয়ে আয়োজক কমিটির একটি অংশ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিতর্কিত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের প্রটোকল ও দাপট বজায় রাখতেই বেশি ব্যস্ত ছিল।
এই বিষয়ে চবির সাবেক ছাত্রদল নেতা খোরশেদ আলম দুঃখ প্রকাশ করে বলেন:
"চবি অ্যালামনাই, মহেশখালী—একটা অনুষ্ঠান করে নিজেদের মধ্যে চরমভাবে তিক্ততা ও একে-অপরের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নষ্ট করা ছাড়া আর কী দিতে পারল?"
মূলত সমন্বয়ক, সংকীর্ণ রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের চক্রান্তের কারণেই মহেশখালীর বুকে চবিয়ানদের এত বড় একটি আয়োজন শেষ পর্যন্ত চরম গ্লানি, বিশৃঙ্খলা ও ব্যর্থতা নিয়ে শেষ হলো।
#CUAlumni2026 #MaheshkhaliNews #ChittagongUniversity #অব্যবস্থাপনা #চবি_অ্যালামনাই

0 মন্তব্যসমূহ