কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, এসপির পিপিএম পদক নিয়ে জনমনে প্রশ্ন

কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, এসপির পিপিএম পদক নিয়ে জনমনে প্রশ্ন


কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, এসপির পিপিএম পদক নিয়ে জনমনে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার

কক্সবাজার জেলা এখন পর্যটন নগরী ছাপিয়ে পরিচিতি পাচ্ছে ‘অপরাধের জনপদ’ হিসেবে। গত কয়েক মাসে জেলায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে খুন, ছিনতাই, অপহরণ ও মারামারির মতো ঘটনা। একদিকে লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে জেলা পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার রাষ্ট্রীয় পদক প্রাপ্তির খবর ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও বিস্ময় জন্ম দিয়েছে।

বিগত ৬ মাসের অপরাধচিত্র: ডজনের বেশি প্রাণহানিকক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলার গ্রাফ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত কয়েক মাসে জেলায় নিহতের সংখ্যা ডজন ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে চলতি বছরের শুরু থেকেই অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে:

  • জানুয়ারি ২০২৬: ১০ জানুয়ারি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সীগাল পয়েন্টে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয় খুলনার সাবেক কাউন্সিলর গোলাম রব্বানীকে।

  • মার্চ ২০২৬: এই মাসে সৈকত সংলগ্ন কবিতা চত্বরে ছাত্রদল নেতা খোরশেদ আলমকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এছাড়া ২৪ মার্চ শহরে এক মাদকাসক্ত ছেলের হাতে জননী খুনের মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে।

  • এপ্রিল ২০২৬: এই এক মাসেই জেলায় অর্ধ ডজনের বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে। উল্লেখযোগ্য হলো:

  • ১৩ এপ্রিল পিএমখালীতে জায়গা বিরোধের জেরে যুবক মুবিনকে কুপিয়ে পা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয়।

  • ২১ এপ্রিল টেকনাফের বাহারছড়া শীলখালীর দুর্গম পাহাড় থেকে তিন যুবকের (রবি আলম, মুজিব ও নুরুল বশর) মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যারা অপহরণের শিকার হয়েছিলেন।

  • ২২ এপ্রিল সদরের খুরুশকুলে মন্দিরের পুরোহিত নয়ন সাধুকে হত্যা করে লাশ পাহাড়ে ফেলে দেওয়া হয়।

  • ৭ এপ্রিল কলাতলীতে সিলভার বে রিসোর্টের সামনে ছিনতাই বা বিরোধের জেরে খুন হন টমটম চালক শওকত আলম।এসপি সাজেদুর রহমানের আমল: অবনতির চরম শিখরপুলিশ সুপার (এসপি) এন এম সাজেদুর রহমানের দায়িত্ব পালনকালে কক্সবাজার শহর ও এর আশপাশে অপরাধের ধরণ বদলেছে। শহর এখন কিশোর গ্যাং, মব সন্ত্রাস ও দিনদুপুরে ছিনতাইয়ের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।১. নিরাপত্তাহীন পর্যটন জোন: পর্যটন রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও কলাতলী ও সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে স্থানীয় ও পর্যটকদের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই। দিনদুপুরে ছিনতাই ও খুনের ঘটনা পুলিশের কর্মদক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।২. টেকনাফে অপহরণ ও মুক্তিপণ: টেকনাফের পাহাড়ি এলাকা এখন অপহরণের স্বর্গরাজ্য। সন্ধ্যা হলেই মানুষ আতঙ্কে ঘর থেকে বের হতে পারছে না। মুক্তিপণ আদায় ও মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যার ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পুলিশকে ‘নির্বিকার’ বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।৩. বিফল তদন্ত ও অপরাধী শনাক্তে ব্যর্থতা: অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তেই দায়িত্ব শেষ করছে; ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন বা মূল হোতাদের গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হচ্ছে।পদক বনাম জনরোষ: প্রশ্নবিদ্ধ পিপিএমজেলায় যখন আইনশৃঙ্খলার এই চরম অবনতি, তখন আগামী ১০ মে পুলিশ সপ্তাহে এসপি সাজেদুর রহমানের ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক’ (পিপিএম) পাওয়ার খবরটি বিদ্রূপের জন্ম দিয়েছে। বীরত্ব ও অপরাধ দমনে অসামান্য অবদানের জন্য এই পদক দেওয়া হলেও কক্সবাজারের বর্তমান বাস্তবতায় এর যৌক্তিকতা নিয়ে সাধারণ মানুষ সরব।পুলিশ সুপারের সাফাই: জনবল সংকটঅভিযোগের বিষয়ে এসপি এন এম সাজেদুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, পুলিশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। তবে এর জন্য তিনি মূলত তীব্র জনবল সংকটকে দায়ী করেছেন। তার দাবি, গত এক সপ্তাহে দৈনিক গড়ে ১০০ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হলেও সীমিত সংখ্যক পুলিশ দিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলার উন্নতির জন্য তিনি স্থানীয়দের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও সামাজিক সচেতনতার ওপর জোর দিয়েছেন।

পর্যটন নগরীতে ছিনতাইয়ের আতঙ্ক: বেপরোয়া চক্র, অসহায় সাধারণ মানুষঃ

কক্সবাজার এখন কেবল ভ্রমণের জন্য নয়, ছিনতাইকারীদের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে। গত কয়েক মাসে জেলাজুড়ে দিন-দুপুরে ও রাতে সমানতালে ছিনতাই, ডাকাতি এবং রাহাজানির ঘটনা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার শহরে স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে পর্যটকদের নিরাপত্তা এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।আলোচিত কিছু ঘটনা ও এলাকা:

  • কলাতলী জোন: গত ৭ এপ্রিল পর্যটন এলাকা কলাতলীতে সিলভার বে রিসোর্টের সামনে টমটম চালক শওকত আলমকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনাটি মূলত ছিনতাই বা বিরোধের জেরে ঘটেছে বলে জানা গেছে।

  • কবিতা চত্বর এলাকা: সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন কবিতা চত্বর এলাকায় ছাত্রদল নেতা খোরশেদ আলমকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনাটি ওই এলাকায় ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যকে জনসমক্ষে নিয়ে আসে।

  • সীগাল পয়েন্ট: বছরের শুরুতেই ১০ জানুয়ারি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সীগাল পয়েন্টে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় সাবেক কাউন্সিলর গোলাম রব্বানীকে। জনাকীর্ণ সৈকতে এমন অপরাধ সংঘটিত হওয়া চরম নিরাপত্তাহীনতারই প্রমাণ।

  • টেকনাফ সড়ক ও পাহাড়: টেকনাফের বাহারছড়া ও উত্তর শীলখালী এলাকায় পাহাড়ী সড়কগুলোতে প্রায়ই অপহরণ ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। সন্ধ্যা হলেই মানুষ ছিনতাইকারী ও অপহরণকারী চক্রের ভয়ে বাড়ি থেকে বের হতে সাহস পায় না।ছিনতাইয়ের এই বিস্তার মূলত কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য এবং ‘মব সন্ত্রাস’ বেড়ে যাওয়ার ফল বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে মেরিন ড্রাইভ—সর্বত্রই ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে জানমালের ক্ষতি করছে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত টহলের কথা বলা হলেও, বাস্তবে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিন্দুমাত্র কমেনি।

কক্সবাজারের সাধারণ মানুষের দাবি, কেবল পদক বা আশ্বাসে নয়, রাজপথে দৃশ্যমান নিরাপত্তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জানমালের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় পর্যটন নগরীর ঐতিহ্য চিরতরে ধূলিসাৎ হতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ