মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে স্ক্র্যাপ টেন্ডারে অনিয়ম; সিন্ডিকেটের ‘আশীর্বাদে’ কাজ পেলেন বিতর্কিত ছাত্রলীগ নেতা

মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে স্ক্র্যাপ টেন্ডারে অনিয়ম; মাহমুদ সিন্ডিকেটের ‘আশীর্বাদে’ কাজ পেলেন বিতর্কিত ছাত্রলীগ নেতা


সাড়ে ৩ কোটি টাকার টেন্ডারে অশুভ আঁতাতের অভিযোগ; ১৩ প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের আড়ালে ‘ম্যানেজ’ গেম

 কক্সবাজার প্রতিনিধি:

কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম মেগা প্রকল্প মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ারড পাওয়ার প্রজেক্টের পরিত্যক্ত মালামাল (স্ক্র্যাপ) বিক্রির টেন্ডারে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (CPGCBL)-এর ঢাকা কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মদ মাহমুদ আলমের বিরুদ্ধে মোটা অংকের কমিশনের বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা তানভীরকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারেরা। দাপ্তরিক প্রক্রিয়াকে কেবল ‘আইনি আবরণ’ দিতে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (OTM) ব্যবহার করা হলেও নেপথ্যে বড় ধরণের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে।

দাপ্তরিক নথিতে অনিয়মের চিত্র

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত দাপ্তরিক নথি (Opening Report) পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিওপি (BOP) এবং সিভিল পোরশন থেকে উৎপাদিত স্ক্র্যাপ সামগ্রী বিক্রির জন্য গত ১৪ মে (২০২৪) একটি দরপত্র (Tender Memo: 27.32.0000.013.07.005.23.3343) উন্মুক্ত করা হয়। এতে মোট ১৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে ‘এনএম কর্পোরেশন’ (NM Corporation) সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৪২ হাজার ১৪৭ টাকা দর প্রস্তাব করে।

অভিজ্ঞতাহীন কোম্পানি ও বিতর্কিত সিন্ডিকেট

অভিযোগ উঠেছে, এনএম কর্পোরেশনের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা এবং পর্যাপ্ত নথিপত্র না থাকা সত্ত্বেও প্রকৌশলী মাহমুদ আলমের সরাসরি হস্তক্ষেপে মাতামুহুরি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীরকে এই কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগ কোটায় কোল পাওয়ারে বালি, পাথর সরবরাহসহ অসংখ্য কাজ বাগিয়ে নেওয়ার রেকর্ড রয়েছে তানভীরের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সেসব কাজেও ভয়াবহ অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী সরবরাহের বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ আছে, টেন্ডার ওপেনিংয়ের সময় তানভীর বা তার কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকলেও তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে, যা পিপিআর (PPR) আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

কমিশন বাণিজ্যের নেপথ্যে প্রকৌশলী মাহমুদ আলম

কালারমারছড়ার স্থানীয় বাসিন্দা ও মহেশখালী উপজেলা শ্রমিকদলের সেক্রেটারি মোঃ সেলিম জানান, প্রকল্পের ঢাকা সদর দপ্তরে প্রায় ৮ বছর ধরে কর্মরত প্রকৌশলী মাহমুদ আলম নিজের প্রভাব খাটিয়ে এই পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোকে সুকৌশলে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে থাকা একটি সিন্ডিকেটকে কাজ দিতে তিনি ‘ম্যানেজ’ গেমের নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্য ঠিকাদারদের দাবি, এই ‘ওপেন টেন্ডার’ ছিল কেবল লোকদেখানো; প্রকৃতপক্ষে আগে থেকেই সব চূড়ান্ত করা ছিল।


জাতীয় এই গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার বা যোগ্য জনবলকে মূল্যায়ন না করে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে কাজ দেওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিজ্ঞতাহীন দুর্নীতিবাজ ও আওয়ামী ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ায় প্রকল্পের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।


প্রকৌশলী ও সচেতন মহলের ভাষ্য

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাহমুদ আলম জানান, “আমি দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর হেড অফিসে কর্মরত এবং এই টেন্ডার প্রক্রিয়ার মূল দায়িত্বে ছিলাম। এখানে কোনো ভুল করিনি। কে আওয়ামী লীগ বা কে বিএনপি—সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়। আওয়ামী লীগ হলেই কাউকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়া মালিক উপস্থিত না থাকলেও টেন্ডার পাওয়া সম্ভব।”

তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বড় ধরণের কারচুপি ও আর্থিক লেনদেন হয়েছে। সরকারের রাজস্ব রক্ষার্থে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এই টেন্ডার প্রক্রিয়ার উচ্চতর তদন্ত প্রয়োজন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ