মহেশখালীতে ২ কোটি টাকার স্কুল ভবন যেন এক ‘মরণফাঁদ’


নিজস্ব প্রতিবেদক:

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া ইউনিয়নের চিকনীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন ভবনটি এখন স্থানীয়দের কাছে এক মূর্ত আতঙ্ক। আধুনিক শিক্ষাঙ্গন তৈরির সরকারি লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে এখানে গড়ে তোলা হচ্ছে একটি সুনিশ্চিত ‘মৃত্যুকূপ’। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি প্রাক্কলন বা সিডিউলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ও জং ধরা লোহা দিয়ে দায়সারাভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘প্যাভিলিয়ন বিল্ডার্স’। ফলে ভবনটি সম্পন্ন হওয়ার আগেই যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

এই মেগা দুর্নীতির নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক সিন্ডিকেট। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় (LGED) থেকে ২ কোটি ১২ লাখ ৬৮ হাজার ২৪৭ টাকার কার্যাদেশ পায় প্যাভিলিয়ন বিল্ডার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী হালিমুর রশিদ পুতু মহেশখালী উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিকের প্রভাব খাটিয়ে তিনি এই কাজ বাগিয়ে নেন। অভিযোগ উঠেছে, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও অদৃশ্য কোনো এক শক্তির সহায়তায় তিনি এখনো প্রশাসনের চোখের সামনে এই অনিয়ম অব্যাহত রেখেছেন।



সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে ভবনের কাঠামোগত ভয়াবহ বিপর্যয়ের চিত্র ধরা পড়েছে। ভবনের মূল ভিত্তি কলাম ও বিম ঢালাইয়ের সময় কারিগরি নিয়ম অনুযায়ী কোনো ভাইব্রেটর মেশিন ব্যবহার করা হয়নি। ফলে কংক্রিটের ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত বা ‘হানি-কম্বিং’। প্রকৌশলবিদ্যায় এটি একটি চরম অপরাধ, কারণ এর ফলে বিমের ভেতরের রডগুলো অনাবৃত থেকে বাতাসের সংস্পর্শে দ্রুত জং ধরে শক্তি হারাচ্ছে। এই নড়বড়ে কাঠামোর ওপর ভবন নির্মাণ করা মানে শত শত শিশুর জীবনকে জেনেশুনে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।

শুধু কাঠামো নয়, উপকরণের ক্ষেত্রেও চলেছে সীমাহীন জালিয়াতি। সিডিউল অনুযায়ী উন্নতমানের ‘সিলেট স্যান্ড’ বা মোটা বালু ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ব্যবহার করা হচ্ছে স্থানীয় ছড়া থেকে উত্তোলিত কাদা মিশ্রিত লালচে বালু। নির্ধারিত ১:২:৪ অনুপাতে সিমেন্ট দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। অনেক জায়গায় ঢালাই শুকানোর আগেই হাতের সামান্য চাপে গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ছে। সিমেন্টের এই ভয়াবহ স্বল্পতা প্রমাণ করে যে, ঠিকাদার ভবন নির্মাণের চেয়ে অর্থ লুটপাটেই বেশি মনোযোগী ছিলেন।



নির্মাণ পদ্ধতিতেও দেখা গেছে আদিম ও অবৈজ্ঞানিক কারসাজি। কোনো প্রকার বেইজ বা পলিথিন ছাড়াই সরাসরি কাদা-মাটির ওপর ঢালাইয়ের মিশ্রণ তৈরি করা হচ্ছে, যা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মৌলিক নিয়মের পরিপন্থী। এতে মাটির আর্দ্রতা ও ধুলোবালি কংক্রিটের গুণমান পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। এছাড়া দরজায় ‘সিজনড’ কাঠের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যন্ত কাঁচা ও অসার কাঠ। ফলে ভবনটি ব্যবহারের আগেই কাঠগুলোতে বড় বড় ফাটল ও কালচে দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহল প্রতিবাদ জানালে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে উল্টো হুমকির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।



২ কোটি ১২ লাখ টাকার এই প্রকল্পের প্রতিটি ইটে এখন দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট। প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা ঠিকাদারের এই বেপরোয়া মনোভাবকে আরও উসকে দিচ্ছে। সচেতন মহলের দাবি, অনতিবিলম্বে এই ‘মরণফাঁদ’ নির্মাণ কাজ বন্ধ করে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ টিমের মাধ্যমে ল্যাবরেটরি টেস্ট করিয়ে কাজের মান যাচাই করতে হবে। একই সাথে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও কোমলমতি শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলার দায়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও তদারকি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ