##ট্যুরিস্ট পুলিশের অবহেলায় ঝুঁকির মুখে ককক্সবাজার পর্যটন শিল্প
কক্সবাজার প্রতিনিধি
পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্টে প্রকাশ্য দিবালোকে পর্যটকদের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা এই তাণ্ডবে কিশোর গ্যাং ও ঘোড়াচালকদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন চার পর্যটক। অভিযোগ উঠেছে, ঘটনাস্থলের খুব কাছে ট্যুরিস্ট পুলিশের বক্স থাকলেও দায়িত্বরত সদস্যরা ছিলেন সম্পূর্ণ নির্বিকার। এমনকি পর্যটন স্পটে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপির অবহেলা ও উদাসীনতায় সৈকত এলাকায় অপরাধীদের দৌরাত্ম্য এখন চরমে।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে বাঁশখালী থেকে আসা পর্যটক এনাম, মিজানসহ চারজনের একটি দল সুগন্ধা পয়েন্টে সমুদ্রস্নানে নামেন। এনামের স্বজন প্রত্যক্ষদর্শী জিয়াউর রহমান জানান, টিউব ভাড়া নেওয়াকে কেন্দ্র করে একদল কিশোর গ্যাং সদস্য প্রথমে তাদের ওপর চড়াও হয়। একপর্যায়ে তারা পর্যটকদের মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিতে গেলে পর্যটকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হকার নামধারী ওই কিশোর অপরাধীরা।
এর কিছুক্ষণ পরেই তাদের সাথে যোগ দেয় ৫-৬ জন ঘোড়াচালক। পর্যটকদের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শী জিয়াউর রহমানের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘোড়াচালকেরা লোহার রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ‘ভিলেন স্টাইলে’ ঘোড়া ছুটিয়ে পর্যটকদের পিছু নেয় এবং দৌড়াতে দৌড়াতে নির্দয়ভাবে আঘাত করতে থাকে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এই তাণ্ডব চললেও কাছেই থাকা ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্সের ভেতর থেকে দুই পুলিশ সদস্যকে পুরো ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে দেখা গেলেও তারা উদ্ধারে এগিয়ে আসেননি। পরে নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগীরা পরিচিত এক পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে সদর থানায় খবর দিলে পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে। বর্তমানে আহত ৪ জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ট্যুরিস্ট পুলিশের নির্লিপ্ততা ও প্রশাসনিক স্থবিরতাঃ
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি উত্তম প্রসাদ পাঠকের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে তীব্র সমালোচনা। অভিযোগ আছে, তিনি অধিকাংশ সময় সরকারি ফোন বন্ধ রাখেন, যার ফলে কোনো সংকটে পর্যটক, ব্যবসায়ী বা গণমাধ্যমকর্মীরা তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন না। এদিনের ঘটনার পরও তাকে ফোন বা মেসেজ দিয়ে কোনো সাড়া মেলেনি।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, উত্তম প্রসাদ পাঠক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। কবিতা চত্বরে ছাত্রদল নেতা ও জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধার নির্মম খুন, জিনিয়া রিসোর্ট থেকে নারী অপহরণ, হোটেলে মাদক ব্যবসা ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে সৈকতকর্মী নুরুল আমিন জানান, “ঘটনাটি পুলিশ বক্সের একদম কাছে ঘটেছে। আমরা গিয়ে হামলাকারীদের তাড়িয়েছি, কিন্তু ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্সে থেকেও আসেনি।”
এসপি উত্তমের মেয়াদে অপরাধের বাড়বাড়ন্তঃ
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশেএসপি উত্তম প্রসাদ পাঠক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে জননিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। গত কয়েক মাসে একের পর এক লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড, নারী অপহরণ, মাদক কারবার এবং পর্যটক মারধরের ঘটনায় সাধারণ পর্যটক ও স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সৈকতের 'কবিতা চত্বর' এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখসারির যোদ্ধা ও ছাত্রদল নেতা খোরশেদ আলমকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি প্রশাসনের চরম ব্যর্থতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। একটি স্পর্শকাতর পর্যটন জোনে দুর্বৃত্তরা কীভাবে এমন দুঃসাহস পায়, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, কেবল খুনের ঘটনাই নয়, হোটেল-মোটেল জোন এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি 'জিনিয়া রিসোর্ট'-এর স্পা সেন্টার থেকে দুই নারীকে অপহরণের ঘটনায় ট্যুরিস্ট পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারির দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন নামি-দামি হোটেলের আড়ালে ইয়াবা বাণিজ্য ও ছিনতাইকারী চক্রের দৌরাত্ম্য বাড়লেও এসপির রহস্যজনক নীরবতা ও দায়িত্বহীনতা পর্যটন খাতকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে পুলিশের তৎপরতা না বাড়িয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উদাসীনতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে দেশের প্রধান এই পর্যটন শিল্পের ওপর।
ঊর্ধ্বতন মহলের হতাশা
কক্সবাজারের এই নিরাপত্তাহীনতা ও ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মাইনুল হাসান। তিনি বলেন, “পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান কাজ। কেউ দায়িত্ব অবহেলা করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একজন এসপির সরকারি ফোন বন্ধ রাখা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি আমি গুরুত্বের সাথে দেখছি।” তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, কক্সবাজারের পর্যটন রক্ষায় দ্রুতই একজন দক্ষ অফিসার নিয়োগের মাধ্যমে এই সংকট উত্তরণের চেষ্টা চলছে।
সৈকতে ঘোড়াচালক ও কিশোর গ্যাংয়ের এমন নৃশংসতা এবং পুলিশের রহস্যজনক নীরবতা পর্যটন শিল্পের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পর্যটনবান্ধব এই শহরটি সাধারণ মানুষের জন্য মূর্তমান আতঙ্কে পরিণত হবে।


0 মন্তব্যসমূহ