৯০ হাজার ঘনফুট পাহাড় সাবাড়: কক্সবাজারে পরিবেশের ক্ষত নিয়ে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা



রামুর কাউয়ারখোপে সাবাড় ৯০ হাজার ঘনফুট পাহাড়: পরিবেশের ক্ষত নিয়ে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও গণমাধ্যমের খবরের পর নড়েচড়ে বসল পরিবেশ অধিদপ্তর; জব্দ হয়েছে এক্সক্যাভেটর ও ডাম্পার

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার | ৩১ মার্চ, ২০২৬

কক্সবাজারের রামু উপজেলায় নির্বিচারে সরকারি পাহাড় কেটে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করার এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের উখিয়ারঘোনার লামারপাড়া, ঘোনারপাড়া ও স্কুলপাড়া এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের এক বিশেষ অভিযানে পাহাড় কাটার এই প্রমাণ মেলে। অভিযানে ১টি এক্সক্যাভেটর ও ১টি ডাম্পার ট্রাক জব্দ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ১২ জনসহ মোট ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।



অভিযানে উন্মোচিত ভয়াবহ চিত্র

পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ পাহাড়খেকো সিন্ডিকেট প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পাহাড়ের মাটি কেটে আসছিল। গত ৩০ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তরের দল যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন তারা পাহাড়ের উপরিভাগের অন্তত ৮ থেকে ৯টি পৃথক স্থানে মাটি কাটার ক্ষত দেখতে পান। প্রাথমিক পরিমাপে দেখা গেছে, ওই চক্রটি পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে প্রায় ৯০ হাজার ঘনফুট পাহাড়ের মাটি কেটে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে দিয়েছে।



পাহাড় কাটার নেপথ্য ও পরিবেশের ক্ষতি

কক্সবাজার ও এর আশেপাশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে অবৈধভাবে মাটি কাটা এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, পাহাড়ের উপরিভাগের মাটি বা 'টপসয়েল' (Topsoil) কেটে ফেলায় মাটির উর্বরতা ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্য স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া বর্ষাকালে এই ধরনের কাটা পাহাড়গুলো চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং ভারী বর্ষণে ধসে পড়ে বড় ধরনের প্রাণহানি ও জানমালের ক্ষতি করে। কাউয়ারখোপেও একই কায়দায় স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের মদদে এক্সক্যাভেটর দিয়ে নির্বিচারে পাহাড় সাবাড় করা হচ্ছিল বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।



গণমাধ্যমের খবরে টনক নড়ল প্রশাসনেরঃ

স্থানীয় সচেতন মহলের একের পর এক অভিযোগ এবং গণমাধ্যমে এই ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পরই টনক নড়ে প্রশাসনের। এর প্রেক্ষিতে সোমবার (৩০ মার্চ) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের একটি বিশেষ দল ওই দুটি স্থানে পৃথক অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে হাতেনাতে পাহাড় কাটার সরঞ্জামাদি উদ্ধারের পর সেগুলো রামু থানায় সোপর্দ করা হয়।




আইনি পদক্ষেপ ও অভিযুক্তদের অবস্থান

সরকারি অনুমোদন ব্যতিরেকে এবং পরিবেশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই অপরাধ সংঘটিত করায় গতকাল ৩১ মার্চ রামু থানায় মামলা (মামলা নং-৭৩) দায়ের করা হয়। এতে নামীয় ১১ জন এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১২ জনসহ সর্বমোট ২৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই চক্রের নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের চিহ্নিত করতে পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত নজরদারিও অব্যাহত থাকবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কক্সবাজারের ভূপ্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং পরিবেশ সুরক্ষায় অধিদপ্তর জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। পরিবেশ বিধ্বংসী যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে এই ধরনের সাঁড়াশি অভিযান নিয়মিত বিরতিতে অব্যাহত থাকবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ