দুর্বল ব্যবস্থাপনা আসন্ন নির্বাচনের মান নষ্ট করবে - সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম

দুর্বল ব্যবস্থাপনা আসন্ন নির্বাচনের মান নষ্ট করবে - সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম


বাংলাদেশ জাতীয় নির্বাচন ২০২৬-এর আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। এরই মধ্যে দেশের রাজনীতির হাওয়া যেন বারুদের মতো উত্তপ্ত হয়ে আছে। প্রচার-প্রচারণার ডামাডোল তুঙ্গে ঠিকই, কিন্তু তাতে উত্তেজনাই বেশি। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে চলছে কাদা ছোড়াছুড়ি আর তিক্ত বাক্যবিনিময়। ভোটের এই পরিবেশের সাথে আরও যুক্ত হয়েছে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, শারীরিক হামলা, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং গণপিটুনির মতো ঘটনা। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, পরিস্থিতি ততই সংঘাতময় হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সহিংসতা এখন আর কেবল আশঙ্কা নয়, বরং এক বাস্তবতায় রুপ নিচ্ছে।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা রীতিমতো হতাশাজনক। এমন ক্রান্তিলগ্নে যেখানে প্রয়োজন ছিল কঠোর নজরদারি আর নির্বাচনী প্রচারে নিশ্ছিদ্র শৃঙ্খলা, সেখানে কমিশন যেন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে ‘নীরব দর্শকের’ ভূমিকায়। তাদের এই নির্লিপ্ততা এবং কর্তৃত্বে অনীহা সাধারণের মনে প্রশ্ন জাগাচ্ছে—আদৌ কি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার সক্ষমতা তাদের আছে?

~একই দিনে গণভোটের জট~
আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর আগেই জটিলতার মেঘ জমতে শুরু করেছে। জাতীয় নির্বাচনের ব্যালটের সঙ্গেই সংস্কার ইস্যুতে ‘গণভোট’ আয়োজনের সিদ্ধান্তটি কেবল সমস্যাসঙ্কুলই নয়, হিতে বিপরীতও হতে পারে। বিশ্বজুড়ে গণভোট নতুন কিছু নয়, কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের দিনেই এমন আয়োজন নজিরবিহীন। সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড কিংবা গুয়ামের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়—প্রক্রিয়াগত জটিলতা এড়াতে তারা গণভোট সাধারণত আলাদাভাবেই আয়োজন করে থাকে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই গণভোটের ফলাফল নির্ধারিত হবে কীভাবে? নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, টু-রাউন্ড ভোটিং সিস্টেম, নাকি ইনস্ট্যান্ট রান-অফ ভোটিং (IRV)-এর মতো কোনো বিকল্প উপায়ে—তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই ‘পরিবর্তিত বোর্ডা কাউন্ট’(Modified Borda Count-MBC)-এর মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতির পরামর্শ দেন। অথচ বাংলাদেশে এই গণভোট বা এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে জনগণকে সচেতন করার কোনো তাগিদ সরকারের মধ্যে নেই। সচেতনতার এই অভাব ভোটের দিন কেন্দ্রে গতি কমিয়ে দেবে এবং নিশ্চিতভাবেই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে।

ভোটারদের সচেতন করার দায়িত্ব ছিল কর্তৃপক্ষের, অথচ তারা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। পুরো বিষয়টিকে নামিয়ে আনা হয়েছে কেবল ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর গণ্ডিতে। তথ্যের অভাবে রাজনৈতিক দলগুলোই এখন ফাঁকা মাঠে প্রচার চালাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে, আর বিএনপি নিরবে ‘না’ ভোটের দিকে ঝুঁকেছে। তার ওপর একই দিনে একই কেন্দ্রে দুটি ভিন্ন ব্যালট সামলানোর মতো লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ—কোনোটিই নির্বাচন কর্মকর্তাদের নেই।

~পোস্টাল ব্যালট ও ব্যবস্থাপনাগত বাধা~
নির্বাচনী জটিলতার আরেকটি স্তরের নাম ‘পোস্টাল’ বা ডাকযোগে ভোট। নির্বাচন কমিশন প্রবাসী ভোটারদের জন্য ৭,৬৬,৮৬২টি এবং দেশের ভেতরের ভোটারদের জন্য ৫,১৮,৬০৩টি পোস্টাল ব্যালট ইস্যু করেছে। এই বিপুলসংখ্যক ব্যালট গ্রহণ, সংরক্ষণ, বিতরণ এবং গণনা—অত্যন্ত উচ্চমানের সাংগঠনিক দক্ষতার দাবি রাখে। এই বিপুল সংখ্যক ব্যালট গ্রহণ, সংরক্ষণ, বিতরণ ও গণনা—সব মিলিয়ে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। জাতীয় নির্বাচন, গণভোট এবং পোস্টাল ব্যালট—এই তিনের জগাখিচুড়ি পাকিয়ে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশেষ করে ডাকযোগে আসা ভোট গণনা নিয়ে সামান্য বিতর্কও বড় সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। ২০২০ সালের যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের কথা মনে করা যেতে পারে—সেখানে ডাকযোগে ভোট জালিয়াতির ভিত্তিহীন অভিযোগ কীভাবে পুরো রাজনৈতিক আলোচনাকে জিম্মি করে ফেলেছিল। বাংলাদেশেও পরাজিত দলগুলো একই অজুহাতে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করতে পারে, যে বয়ানের ক্ষেত্র এখনই তৈরি হচ্ছে।

~অতীতের আয়নায় বর্তমানের বিবর্ণ দশা~
১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনগুলোর দিকে তাকালে বর্তমান চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। ওই নির্বাচনগুলোকে নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড বা ‘বেঞ্চমার্ক’ ধরা হয়। সে সময় নির্বাচনের আগে চলত জোরালো অস্ত্র উদ্ধার অভিযান, অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে থাকত কঠোর দমনপীড়ন। প্রার্থীদের দ্বৈত নাগরিকত্ব, ঋণখেলাপি ও অপরাধের রেকর্ড কঠোরভাবেই যাচাই-বাছাই করা হতো। গণমাধ্যমের ওপর থাকত নিবিড় পর্যবেক্ষণ, নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে কর্মকর্তাদের রদবদল হতো এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনে নেওয়া হতো ত্বরিত আইনি ব্যবস্থা।

এর বিপরীতে, আজ এসব ব্যবস্থার ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই। তফসিল ঘোষণার পর নতুন কোনো অস্ত্র উদ্ধার অভিযান দেখা যায়নি। অপরাধী চক্র বহাল তবিয়তে সক্রিয়, প্রার্থী যাচাই-বাছাই হয়েছে ঢিলেঢালাভাবে। আর্থিক ও অপরাধমূলক রেকর্ডের যাচাই হয়েছে নামমাত্র। গণমাধ্যমেও একটি নির্দিষ্ট দল বা রাজনৈতিক পরিবারের ওপর অতিমাত্রায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দৃশ্যমান উদাসীনতা কেবল পক্ষপাতিত্বের ধারণাকেই উসকে দেয়নি, বরং নির্বাচন-পরবর্তী বিরোধের পটভূমি তৈরি করে রেখেছে।

~অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা~
সমালোচনার তীর থেকে রেহাই পাচ্ছে না অন্তর্বর্তী সরকারও। ড. ইউনূসের লন্ডন সফরের পর থেকে বিএনপির দাবির প্রতি তাদের নমনীয়তা সবার নজর কেড়েছে। ঢাকায় ফেরার পর জনাব তারেক রহমানকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও নিরাপত্তা দেওয়ার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক ভারসাম্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দিয়েছে। কেউ কেউ একে ‘সময়ের দাবি’ বললেও, অন্যরা দেখছেন ‘পক্ষপাতমূলক আচরণ’ হিসেবে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মনে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় দানা বেঁধেছে। ক্রমশ মনে হচ্ছে, প্রশাসন হয়তো রাজনৈতিক আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবেই বিএনপির সঙ্গে সহাবস্থানে কাজ করছে।

~কী অপেক্ষা করছে ভোটের দিন~
দিনশেষে মূল প্রশ্নটি হলো—এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে নির্বাচন আদৌ অবাধ ও সুষ্ঠু হবে কি না? কেবল বাক্স-ব্যালটের কারিগরি আয়োজন সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতি একটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে পারে না। এমনকি ৪০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করাও এবার কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে এবং তাদের নেতৃত্ব নির্বাচন বর্জনের ডাক দেওয়ায় দলটির কর্মী-সমর্থকদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তার ওপর নির্বাচনপূর্ব সহিংসতা এবং প্রথাগতভাবে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রিক অনানুষ্ঠানিক নির্বাচনী অর্থনীতির অনুপস্থিতি ভোটার উপস্থিতি আরও কমিয়ে দিতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে। জুলাই বিপ্লবের রেশ এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক স্থবিরতায় বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনী—সবাই কিছুটা দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন রাজনৈতিকভাবে সরকারের অনুগত হতে পারে ঠিকই, কিন্তু কারচুপি রোধ বা সহিংসতা দমনে তাদের সক্ষমতা কতটুকু, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

বিএনপি আশা করছে বিশাল জয়ে সরকার গঠন করবে, অন্যদিকে জামায়াতের লক্ষ্য ১৬০ থেকে ১৭০টি আসন। জামায়াতের এই সম্ভাব্য উত্থান নিয়ে জল্পনা-কল্পনার কারণে বিএনপির কিছু প্রার্থী ইতিমধ্যেই ভোটকেন্দ্র আগেভাগে দখলের কথা প্রকাশ্যে আলোচনা করছেন। অথচ নির্বাচন কমিশন এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্যই করেনি। এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধে উসকে দিতে পারে এবং ভোট গ্রহণ ও গণনার সময় জন্ম দিতে পারে ব্যাপক সহিংসতার।

~ভোট গণনার চ্যালেঞ্জ ও কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন~
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সম্ভবত সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও জটিল ধাপ হতে যাচ্ছে ‘ভোট গণনা’। ব্যালট গুলিয়ে ফেলা, ভোটবাক্স অদলবদল এবং জাতীয় নির্বাচন, গণভোট ও পোস্টাল ভোট একসঙ্গে গণনার ফলে প্রক্রিয়াটি অবধারিতভাবেই ধীরগতির হবে। এই বিলম্ব জন্ম দেবে সন্দেহের, উসকে দেবে আইনি চ্যালেঞ্জ। গণভোটে ভোটদানের হার কম হলে এর বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, আবার অংশগ্রহণের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর যেকোনো চেষ্টা গোপন রাখা কঠিন হবে।

বেশ কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। নির্বাচন যদি কারসাজির শিকার হয়, তবে সংক্ষুব্ধ দলগুলো কি ভোটের দিন বর্জন করবে? যদিও ইতিহাস বলে, এমন বর্জনে ফলাফল খুব একটা বদলায় না। পরাজিত দলগুলো কি ফলাফল মেনে নেবে, নাকি নির্বাচনকে ‘চুরি’ আখ্যা দিয়ে পুনরায় ভোটের দাবি তুলবে? ভোটাররা যদি সংস্কার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তবে সংস্কারপন্থীরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন? আর পাস হলে বিরোধীরাই বা কী করবেন? সবশেষে, দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপ নিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী আইনি লড়াই কি ফলাফল উল্টে দেওয়া এবং সংসদীয় সমীকরণ বদলে দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারবে।
ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশ ততই এক ভাগ্যনির্ধারণী মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এই নির্বাচন কি জাতিকে আরও বিভক্ত করবে, নাকি গণতান্ত্রিক আস্থার জায়গাটি কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার করবে—তা এখন আর কেবল প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করছে না, বরং তা নির্ভর করছে দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহি এবং নির্বাচনী শুদ্ধতা রক্ষার সদিচ্ছার ওপর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ