চার ভাগে ভাগ হচ্ছে সেন্টমার্টিন, এক এলাকায় প্রবেশই নিষিদ্ধ




অস্তিত্ব রক্ষায় সরকারের মহাপরিকল্পনা; ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটন বন্ধের ইতিবাচক প্রভাব

নিজস্ব প্রতিবেদক: কয়েক দশকের অবহেলা, অপরিকল্পিত স্থাপনা আর পর্যটনের ভারে বিপন্ন দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। দ্বীপটির মুমূর্ষু বাস্তুতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবার একে চারটি আলাদা অঞ্চলে (জোন) ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়া মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্বীপের একটি বড় অংশে মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে এবং বাকি অংশেও পর্যটন হবে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক কর্মশালায় সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) এই মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করে।

সেন্টমার্টিনের চার জোন: কোথায় কী করা যাবে?

দ্বীপের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে মহাপরিকল্পনায় এলাকাগুলোকে যেভাবে ভাগ করা হয়েছে:

  • রেস্ট্রিক্টেড জোন (নিষিদ্ধ এলাকা): জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে এই এলাকায় কোনো মানুষের প্রবেশ অনুমোদিত হবে না। এটি হবে দ্বীপের সবচেয়ে সুরক্ষিত অংশ।

  • ম্যানেজড রিসোর্স জোন (সংরক্ষিত এলাকা): এটি মূলত কচ্ছপের প্রজনন ক্ষেত্র। এখানে পর্যটকরা কেবল দিনে ঘুরে দেখতে পারবেন, তবে রাতে থাকার কোনো অনুমতি থাকবে না। স্থানীয়রাও এখান থেকে কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ করতে পারবে না।

  • সাসটেইনেবল ইউজ জোন (টেকসই এলাকা): এখানে রয়েছে বুশল্যান্ড, লেগুন ও ম্যানগ্রোভ বন। পর্যটকরা দিনে প্রবেশের সুযোগ পেলেও রাতে থাকতে পারবেন না। সরকার নির্ধারিত নিয়মে স্থানীয়রা সীমিত সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে।

  • জেনারেল ইউজ জোন (সাধারণ এলাকা): পর্যটনসহ সাধারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কেবল এই জোনেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সব হোটেল ও রিসোর্টকে এই জোনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

সংরক্ষণই অগ্রাধিকার, পর্যটন নয়

কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “সেন্টমার্টিন ও পর্যটন সমার্থক হতে পারে না। এই দ্বীপের প্রথম অগ্রাধিকার হতে হবে এর সংরক্ষণ।” তিনি জানান, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৯ মাস পর্যটন বন্ধ রাখার ফলে দ্বীপের প্রকৃতি কিছুটা নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান।

উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন, আট হাজার বাসিন্দার এই দ্বীপে প্রতিদিন ১০ হাজার পর্যটকের চাপ স্থানীয়দের জীবন ও পরিবেশের ওপর বড় আঘাত। তিনি দ্বীপে জেনারেটরের বদলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দেন।

৭০ শতাংশ প্রবাল বিলীন

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান এক ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরে বলেন, আশির দশকের তুলনায় বর্তমান সেন্টমার্টিনের চিত্র অনেক করুণ। দ্বীপের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রবাল ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। সিইজিআইএসের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ এইচ এম নুরুল ইসলাম জানান, জাহাজের নোঙরের আঘাত, অতিরিক্ত লবস্টার আহরণ এবং বিদেশি উদ্ভিদের বিস্তার দ্বীপের আদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে।

বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি

সরকার বলছে, সেন্টমার্টিনকে কেবল পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে না রেখে স্থানীয়দের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। মৎস্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হস্তশিল্প ও নিয়ন্ত্রিত মৎস্য ব্যবস্থাপনাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ