‘আজীবন আওয়ামী লীগের পাশে’ থাকার অঙ্গীকার যাঁর, তিনিই চন্দনাইশে বিএনপির প্রার্থী!



সাবেক আইজিপি বেনজীর-শহীদুল হকের ব্যবসায়িক অংশীদার জসিমকে নিয়ে বিএনপিতে তোলপাড়; ক্ষুব্ধ তৃণমূল


নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ার আংশিক) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন আহমেদের নাম আসায় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিস্ময় ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ‘রামাদা জসিম’ হিসেবে পরিচিত এই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলি চালানো, হত্যা মামলা এবং ব্যাংক ঋণখেলাপিসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। গত ৫ আগস্টের আগে ‘মৃত্যুর আগ পর্যন্ত’ আওয়ামী লীগের পাশে থাকার প্রকাশ্য অঙ্গীকার করা একজন ব্যক্তিকে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়ায় দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘নিবিড়’ সখ্য: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে জসিম উদ্দিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ২০২৪ সালের উপজেলা নির্বাচনের এক সভায় তিনি সগৌরবে ঘোষণা করেছিলেন, “এই ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সাথে আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকব।” এমনকি জয় বাংলা স্লোগানেও তাঁকে কণ্ঠ মেলাতে দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ ও শহীদুল হকের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে তিনি বিগত সরকারের আমলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।

হত্যা মামলা ও ঋণখেলাপির বোঝা: জেসিকা গ্রুপের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন আহমেদের অতীত রেকর্ড বেশ বিতর্কিত। তিনি চট্টগ্রামের আলোচিত হৃদয় তরুয়া হত্যা মামলা এবং ছাত্র আন্দোলনের যোদ্ধা এমদাদকে গুলি করার মামলার অন্যতম আসামি। এমনকি গত বছরের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বাড্ডায় ছাত্র আন্দোলনে হত্যাচেষ্টা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। এ ছাড়া, পদ্মা ব্যাংকের ঋণখেলাপি মামলায় তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ৫ মাসের কারাদণ্ড ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত।

তৃণমূলের ক্ষোভ ও ‘মানি পাওয়ার’: বিএনপির দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের পাশ কাটিয়ে একজন ‘আওয়ামী দোসরকে’ মনোনয়ন দেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। এই আসনের অন্য দাবিদার শফিকুল ইসলাম রাহী ফেসবুকে লিখেছেন, “মানি ইজ পাওয়ার”। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “দলের ক্ষুদ্র কোনো কর্মী মনোনয়ন পেলেও মেনে নিতাম। কিন্তু একজন আওয়ামী দোসরকে সংসদে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়াটা জনগণের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।”

প্রার্থীর আত্মপক্ষ সমর্থন: এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জসিম উদ্দিন আহমেদ অনেকটা কৌশলী ভূমিকা নেন। তিনি বলেন, “বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাথেও আমার ছবি আছে। আমি মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।” তবে আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করার সেই ভাইরাল ভিডিওর প্রসঙ্গে প্রশ্ন করতেই তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

অপেক্ষায় কেন্দ্রীয় ঘোষণা: যদিও বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে এখনো প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশ করা হয়নি, তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে জসিম উদ্দিনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তৃণমূলের এই তীব্র প্রতিবাদ ও প্রার্থীর বিতর্কিত অতীত পর্যালোচনায় বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোনো পরিবর্তন আনে কি না।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ